১০৭। সূরা আল মাঊন (সহযোগিতা)
সূরার সারসংক্ষেপঃ
শুরুতেই আল্লাহ প্রশ্ন করার মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন। একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের প্রশ্ন করেন এক্টিভ পার্টিসিপেশনের জন্য, চিন্তা করার জন্য। ঠিক তেমনি আল্লাহ আমাদের সবার শিক্ষক। এই সূরার পরবর্তি বিষয়সমূহ নিয়ে এক্টিভলী পার্টিসিপেট করা ও চিন্তা করার জন্য তিনি প্রশ্ন আকারে বক্তব্য শুরু করেছেন।তখনকার কুরইশ নেতাদের ধার্মিকতার লেবাস ছিলো কিন্তু দূর্বলের উপর চলমান সোসাল ক্রাইম করার ক্ষেত্রে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত। আল্লাহ চোখে আঙ্গুল দিয়ে এই সব চারিত্রিক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। তাদের নৈতিক চরিত্রের দূর্বলতাকে ফুটিয়ে তুলে তাদেরকে অপদস্ত করেছেন। মুহাম্মাদ (স) তখন মক্কায় ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন না। তাঁর মুখ থেকে তৎকালীন নেতাদের এই সব দূর্বলতা ও অবিচারগুলো প্রকাশ করে দিয়ে সমালোচনা করার শিক্ষা আল্লাহ দিয়েছেন।
আল্লাহর কুরআন সময়ের বন্ধনে আবদ্ধ নয়। সব যুগের সব অহংকারী, লোক দেখানো ধার্মিক ও মানুষকে যথাযথ সম্মান ও অধিকার না দেওয়া মানুষদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করায় এই সূরা।
১ম আয়াতে তাদেরকে কি চেনা যায় যারা দ্বীন ইসলাম/ আখিরাতকে অস্বীকার করে? প্রশ্ন করে আল্লাহ নিজেই উত্তর দিয়েছেন। এখানে ‘ইউকাযযিবু’ মানে যে জেনে বুঝে অস্বীকার করার পাশাপাশিএটাকে মিথ্যা হিসাবে প্রচার করে এবং এর ব্যাপারে মিথ্যা বিষয় বানিয়ে রটনা করে। এখানে যদি ইউকাফফিরু বলা হলো তাহলে বোঝানো হতো যে জেনে বুঝে অস্বীকার করে। অর্থাৎ সেই ব্যক্তি কত জঘন্য যে মিথ্যা রটনা করে।
আল্লাহ তাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ও চেনার নমুনা প্রকাশ করেছেন এর পরে। ২য় আয়াতেই সমাজের সবচাইতে দূর্বল ও করুনা পাবার যোগ্য ব্যক্তি এতিমের প্রতি তার খারাপ ব্যবহারের স্বভাবটি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ইয়াদু’ অর্থ গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া। এমনিতে এতিমরা ছোট মানুষ, ছোটরা সাধারনত ভালোবাসা পায় সবার কাছ থেকে কিন্তু এখানে ভালবাসার বদলে তাদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে! এ কেমন নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা! এখানে তাদের পরিচয় দেয়ার সময় আল্লাহ ‘যালিকা’ শব্দ ব্যবহার করে (‘হাযা’ ব্যবহার না করে) এজাতীয় মানুষের প্রতি আল্লাহ দূরত্ব ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
আল্লাহর শব্দচয়ন কি অসাধারন বিজ্ঞতাপূর্ন! ৩য় আয়াতে আল্লাহ ‘ত্বয়াম’ (খাদ্য) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ‘ত্বয়ামিল মিসকীন’ মানে দরিদ্রের খাবার। ‘ইত্বয়াম’ (অর্থ খাওয়ানো) না বলে ‘ত্বয়াম’ বলার ফলে এর অর্থ দাঁড়ায় যে এটা ধনীদের সাধারন দান নয় বরং দরিদ্রের জন্যই নির্ধারিত খাবার, তাদেরই অধিকার। ধনীদের কাছে থাকলেও তারা সেই খাবারের মালিক নয়; এটার মালিকানা মূলত দরিদ্রদের। এখানে তাদের কথা বলা হয়েছে যারা সেই খাবার দিতে উৎসাহ দেয় না।তারা ভালো কাজ তো করেই না বরং অধিকার বঞ্চিত করে ও অন্যকেও ভালো কাজের উৎসাহ দেয় না। বরং এটাকে অপ্রয়োজনীয় ও লোকসানী কাজ হিসাবে প্রচার করে।
সূরার ৫ম আয়াতে “নামাজের ব্যাপারে গাফিলতি’ এর বিষয়টি আল্লাহ বলেছেন। তিনি বলেছেন ‘আন সলাতিহিম সাহুন’ এর বদলে যদি তিনি বলতেন ‘ফি সলাতিহিম সাহুন’ তাহলে আমরা অনেকেই বিপদে পড়ে যেতাম। ‘ফি সলাতিহিম সাহুন’ অর্থাৎ নামাজের মধ্যে গাফেল। নামাজের মধ্যে আমাদের অনেকেরই বিভিন্ন চিন্তা ঢুকে যায়, অন্যদিকে মন চলে যায়। এটিকে আল্লাহ বড় করে দেখেননি বরং নামাজ পড়া ব্যাপারে গাফিলতির বিষয়টি এনেছেন। এভাবে ‘ফি’ না বলে ‘আন’ বলার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের উপর রহম করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
একটি বাড়িতে যদি ৫ টি পিলার/কলাম থাকে তাহলে সেগুলো জায়গামতই রাখতে হয়, সরানো যায় না। আসবাবপত্র রাখতে হলে সেগুলোর জায়গা পরিবর্তন করে নিতে হয়। আসবাপত্র বা অন্য কম গুরুত্বপূর্ন জিনিস ঠিক রেখে কলাম সরালে পুরা বাড়িটাই ভেঙ্গে পড়ে। তেমনি ৫ ওয়াক্ত নামাজ ঐ বাড়ির ৫ টি পিলার/ কলাম এর মত। নামাজ জায়গামতই রাখতে হয়, সরানো যায় না। অন্য কাজ করতে হলে সেগুলোর সময় পরিবর্তন করে নিতে হয়। অন্য কম গুরুত্বপূর্ন জিনিস ঠিক রেখে নামাজ সরালে বা না পড়লে পুরা জীবনটাই ভেঙ্গে পড়ে। নামাজকে অন্য কাজের সাথে এডজাস্ট করে নয় বরং অন্য সকল কাজকে নামাজের সাথে এডজাস্ট করে করতে হবে। তাহলে নামাজ জীবনকে কেন্দ্র করে সম্পন্ন হবে না বরং জীবন নামাজকে কেন্দ্র করে অতিবাহিত হবে।
৬ষ্ঠ আয়াতে যে সকল মানুষ লোক দেখানো কাজ করে তাদের কথা বলা হয়েছে। আগের আয়াতে নামাযে উদাসীন ব্যক্তিদের কথা বলার পরে এই আয়াতে লোক দেখানো কাজ বলতে নামাযকে বোঝানো হতে পারে আবার অন্য যেকোন ভালো কাজকে বোঝানো হতে পারে।
কাউকে দেখানোর জন্য কাজ করলে সেই কাজটি যে করে তা তার জন্য মূলত কল্যান বয়ে নিয়ে আসে না বরং তা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও অকল্যান এর কারন হয়। তাই, কাজের মূল উদ্দেশ্য কাউকে দেখানোর জন্য নয় বরং তা হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।মূলতঃ যে কোন কাজ; বিশেষ করে ভালো কাজের জন্য লোক দেখানো নয় বরং নিয়তটা গুরুত্বপূর্ন। তবে নিয়ত শুদ্ধ রেখে অন্যকে উতসাহিত করার জন্য কিছু কিছু ভালো কাজের প্রচার, প্রসার শুধু জায়েজই নয় বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয়।
সূরার শেষ আয়াতে বর্ননা এসেছে যে, ঐ সকল মানুষের চরিত্র এত নিচু পর্যায়ের যে সামান্য কিছু দিয়ে কাউকে সাহায্য করতেও তারা চায় না। যাকাত (যেহেতু এটি সম্পদের মাত্র আড়াই পার্সেন্ট অর্থাৎ ক্ষুদ্র অংশ), একটু হাসিমুখে কথা, পানি, টিস্যু, লবন দিতেও তারা অস্বীকৃতি জানায়।
১ম (১) আয়াতে নিজ ও আল্লাহর প্রতি অন্যায় এর বিষয়টি এসেছে। পরের ২ (২, ৩) আয়াতে মানুষের প্রতি অন্যায়, তাদের অধিকারের প্রতি অবমাননা এর বিষয়টি ফুটে উঠেছে। পরের ৩ (৪, ৫, ৬) আয়াতে আল্লাহর প্রতি অন্যায় ও তার অধিকারের প্রতি অবমাননা ও প্রতারনা এর বিষয়টি ফুটে উঠেছে। শেষ (৭) আয়াতে মানুষের প্রতি অন্যায় এর বিষয়টি এসেছে।
কিছু মানুষ আছে যারা খুব বেশি দান করে কিন্তু আল্লাহর বিধিবিধান মেনে চলে না। আবার কিছু মানুষ আছে যারা খুব ইবাদাত করে কিন্তু মানুষের প্রতি খারাপ আচরন করে। এ দুটি বিষয়কে আলাদা করে না দেখে আল্লাহ ও মানুষে উভয়ের প্রতি কর্তব্য পালন করার শিক্ষা দেয় এই সূরা। আল্লাহ ও মানুষ উভয়ের কর্তব্য পালন করাই আখিরাতে বিশ্বাসের প্রমান, পরিচায়ক।
মানুষ যখন ব্যক্তি জীবনে (এক বচনে) ১ম অংশে বর্নিত কাজগুলো করে তখন সমাজ জীবনে (বহু বচনে) ২য় অংশে বর্নিত কাজগুলো প্রকাশ পায়। ১ম অংশের আয়াত ১ অনুসারে যখন মানুষ আল্লাহর দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তখন ২য় অংশের আয়াত ৪ ও ৬ অনুসারে সে নামাজে উদাসীন থাকে ও লোক দেখানো কাজ করে। অন্যদিকে ২য় অংশের আয়াত ৬ অনুসারে মানুষেরা যখন নূন্যতম বিষয়ে সাহায্য করে না তখন সমাজের দূর্বল এতিম ও মিসকিন তাদের প্রাপ্য পায় না, অত্যাচারিত, নিপীড়িত হয়।যেহেতু সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম নামাজ সম্পর্কেই তারা উদাসীন, তাই নামাজের বাইরে তাঁর সৃষ্টির অধিকার সম্পর্কে তারা উদাসীন হবে এটাই স্বাভাবিক।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের ১০৬ তম সূরা আল কুরইশ (goo.gl/zfWSpu) এ আল্লাহ কুরইশদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা বর্ননা করেছেন এবং এর শুকরিয়া স্বরূপ তাদের কি করা উচিত তা বর্ননা করেছেন। কিন্তু আসলে তারা কি করছে তা এই সূরায় (১০৭ তম সূরা আল মাঊন এ) উঠে এসেছে।
সূরা আল কুরইশ এ আল্লাহর প্রতি কুরইশদের অবাধ্যতা প্রকাশ পেয়েছে আল্লাহর ইবাদাত না করার মাধ্যমে। সূরা আল মাঊন এ বান্দাহর/মানুষের প্রতি কুরইশদের অবিচার প্রকাশ পেয়েছে নূন্যতম অধিকারও না দেয়ার মাধ্যমে। সুতরাং সূরা আল কুরইশ এ স্রষ্টার ও সূরা আল মাঊন এ সৃষ্টির অধিকার না দেয়ায় অর্থাৎ হাক্কুলাহ ও হাক্কুল ইবাদ পূর্ন না করায় কুরইশদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক দৈণ্যতা প্রকাশ পেয়েছে।
তারা আসলে আল্লাহর অধিকার (হাক্কুল্লাহ) ও মানুষের অধিকার (হাক্কুল ঈবাদ) ২ টাই লঙ্ঘন করে। আগের সূরায় আল্লাহর ভাষা পজিটিভ (নিয়ামতের কথা স্মরণ করানো) হলেও এই সূরায় আল্লাহর ভাষা কিছুটা রুক্ষ হয়েছে এবং তিনি তাদের চরিত্রের নেগেটিভ দিকগুলো তুলে ধরেছেন।
এছাড়াও ৯৫ তম সূরা আত ত্বীন এর সাথে এই সূরা (১০৭ তম সূরা আল মাঊন ) এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরায় মক্কার কাবার কুরইশ কাস্টোডীয়ানদের (তত্তাবধায়ক) চরিত্রের দূর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে যদিও আল্লাহ তাদের উপর অনেক অনুগ্রহ করেছিলেন যার বর্ননা এসেছে সূরা (নং ১০৬) আল কুরইশ এ। তাই যেহেতু তারা ফেইল করেছে তাই আল্লাহ পরের সূরা (নং ১০৮) আল কাউসার এ কাবার যোগ্য কাস্টোডীয়ান এর বর্ননা এনেছেন। মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ননা করেছেন এবং আল্লাহর প্রত্যাশা বর্ননা করেছেন যেমনটি আল্লাহ করেছিলেন কুরইশদের কাছ থেকে কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে।












মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন